আজ ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৩ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম:
বিআরটিসি’র বিরুদ্ধে বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে অপতৎপরতাকারীদের বিরুদ্ধে সাইবার আদালতে মামলা। চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়ালো বিআরটিসি। এডভোকেট সোহানা তাহমিনার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা উচ্চ আদালতে। মুন্সিগঞ্জ-২ আসনে ট্রাক প্রতিক নিয়ে নির্বাচন করবেন এড, সোহানা তাহমিনা। লৌহজংয়ে নানা আয়োজনে যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান বিজয় দিবস পালিত। মুন্সীগঞ্জে বর্ণাঢ্য আয়োজনে ও বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী পালিত হল মহান বিজয় দিবস। লৌহজং উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে বিজয় দিবস উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী মেলার আয়োজন। লৌহজংয়ে আদালতের রায় অমান্য করে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, মানবেতর জীবন-যাপন ভুক্তভোগী পরিবার। লৌহজংয়ে ভাওতা দিয়ে লবণের বিনিময়ে সর্বস্ব লুট! লৌহজংয়ে ৫ জয়িতার সম্মাননা লাভ।
||
  • Update Time : জানুয়ারি, ২, ২০২২, ৬:৩৫ পূর্বাহ্ণ

রাজধানীর উত্তরা পাসপোর্ট অফিসে পুরোনো চিত্র : ঘুসের ড্রাইভিং সিটে দালাল আড়ালে ভাগ পান কর্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর উত্তরা পাসপোর্ট অফিস। ঢুকতেই চকচকে তথ্য কেন্দ্র। কোলাহলমুক্ত ছিমছাম পরিবেশ। রীতিমতো মুগ্ধ হবেন যে কেউ। তবে এমন মনোমুগ্ধকর পরিবেশের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। সবই মেকি। লোক দেখানো। বাস্তবে পদে পদে বেঁধে দেওয়া ঘুস কারবার চলছে বহাল-তবিয়তে। ঘুস ছাড়া ঘাটে ঘাটে বোকার মতো হেনস্তা হতে হবে।

সময় মতো কোনো সেবাই মিলবে না। আর যদি জিদ করে একেবারে অফিস প্রধান পর্যন্ত সাক্ষাৎ পেতে চান, তাহলে কপালে মিলবে আরও বড় বিপদ। পাসপোর্টের জন্য সংশ্লিষ্ট ফরমে তিনি কয়েক স্থানে বসিয়ে দেবেন গোল চিহ্ন। এই গোল চিহ্ন যুক্ত ফরমের কেউ আর রিসিভ করতে চাইবেন না। দালালদের কাছে গেলে তারা চিহ্ন দেখে সাফ জানিয়ে দেবেন আপনি ভাই টাকা খরচ করার পাবলিক না, ডিডি পর্যন্ত গেছেন। এই ফাইল নিয়ে কোনো কাজ হবে না। সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের প্রত্যেককে পাতানো ঘুসের ফাঁদে পা দিতেই হবে। পরিচয় গোপন রেখে সেবাপ্রার্থী সেজে তথ্যানুসন্ধানকালে এ রকম বহু দৃশ্য ধরা পড়ে।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, ফরম পূরণ থেকে শুরু করে ছবি তোলা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে অন্তহীন হয়রানির শিকার হচ্ছেন পাসপোর্টপ্রত্যাশীরা। তবে পাসপোর্ট কর্মকর্তাদের নিজস্ব দালালের হাতে ঘুসের টাকা দিতে পারলেই সব মুশকিল আসান। সহসা মিলে যাবে সমাধান।

দেখা যায়, পাসপোর্টের বিভিন্ন কাজে ঘুসের রেট ভিন্ন ভিন্ন। যেমন শিডিউল ভেঙে আবেদন জমা করতে আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকা। পুলিশ ভেরিফিকেশন এড়িয়ে পাসপোর্ট পেতে পাঁচ হাজার এবং ভুল সংশোধনে ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। এছাড়া ফরম পূরণ থেকে শুরু করে হাতে রেডি পাসপোর্ট পৌঁছে দেওয়ার জন্য চালু আছে বিশেষ প্যাকেজ। যার সর্বনিম্ন প্যাকেজ মূল্য ১৫ হাজার টাকা।

টেস্ট কেস : একটি পাসপোর্ট পেতে কত ধরনের হয়রানি এবং ঘুস বাণিজ্যের মুখোমুখি হতে হয় তার সরেজমিন চিত্র তুলে আনতে সক্ষম হয় অনুসন্ধান টিম। এজন্য কেসস্টাডি হিসেবে অনুসন্ধান টিমের এক সদস্যের পাসপোর্ট নবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রতিটি ধাপের সংশ্লিষ্টদের কথাবার্তা রেকর্ড করতে তার সঙ্গে যুক্ত করা হয় গোপন ক্যামেরা। এভাবে পুরো অনুসন্ধানের অডিও-ভিডিও ধারণ করা হয়।

২৭ ডিসেম্বর সকাল ১১টা। উত্তরা পাসপোর্ট অফিসের সামনে হাজির অনুসন্ধান টিমের সদস্যরা। অফিস ভবনের পশ্চিমে মাত্র ১০ গজের মধ্যে একটা টিনের ছাপরা ঘর। সেখানে কম্পিউটারে ফরম পূরণের কার্যক্রম চলছে। এক জায়গায় দোকানের নাম লেখা কেএমএম এন্টারপ্রাইজ। ৩-৪ জন দালাল ফরম পূরণে ব্যস্ত। কয়েকজন বাইরে ঘোরাফেরা করছেন। নানাবিধ সমস্যা নিয়ে তাদের কাছে যাচ্ছেন পাসপোর্টপ্রত্যাশীরা। লেনদেন শেষ হলে সমাধানের রাস্তাও বাতলে দিচ্ছেন দালালরা।

দুপুর ১২টা। অনুসন্ধান টিমের এক সদস্য ই-পাসপোর্ট ফরম পূরণের জন্য দোকানে ঢোকে। ৩শ টাকার চুক্তিতে শুরু হয় কম্পিউটারে ডাটা এন্ট্রি। সেখানে একসঙ্গে ১০-১২ জনের ফরম পূরণের কাজ চলছে। আরও কয়েকজন সিরিয়াল দিয়ে আছেন অপেক্ষায়। আধা ঘণ্টার মধ্যে ফরম পূরণ শেষ। তিন পাতার আবেদন ফরম প্রিন্ট করে ধরিয়ে দিলেন দালাল আলামিন। কিন্তু জটিল সমস্যা দেখা দেয় আবেদনপত্র জমার তারিখ নিয়ে। কারণ তারিখ পড়েছে তিন মাস পর। আগামী মার্চের ২ তারিখ।তবে এই সমস্যার সমাধানও আছে। জানালেন দালাল। তাকে আড়াই হাজার টাকা দিলে জমা করা যাবে আজই। এত টাকা কেন-এমন প্রশ্ন শুনে মুচকি হাসি দিয়ে তিনি বলেন, ফরম লইয়া ভিতরে যান, দ্যাহেন নিজেরা জমা দিতে পারেন কিনা। যদি না পারেন তহন আইসেন।

আসল বাস্তবতা কী তা বোঝার জন্য অনুসন্ধান টিম নিজেরা ফরম জমা দেওয়ার চেষ্টা করে। তখন বেলা পৌনে ২টা। পাসপোর্ট অফিসে ঢুকতেই কাচঘেরা ছোট একটা কক্ষ। সেখানে বসে আছেন এক পুলিশ সদস্য। নেমপ্লেটে লেখা সম্রাট। পদবি এএসআই। তিনি পরিচয় জানতে চান। পাসপোর্টপ্রত্যাশী শুনে কাগজপত্র পরখ করেন তিনি। বলেন, ডেট ছাড়া এটা কীভাবে জমা দেবেন। বাইরে গিয়ে পদ্ধতি জেনে আসেন। না হলে শুধু ঘুরবেন। বিশ্বাস না হলে ভেতরে যান, দ্যাখেন।দোতলায় ওঠার কাছে নবনির্মিত চকচকে তথ্যকেন্দ্র। সেখানে দাঁড়াতেই এক কর্মচারী হাত বাড়িয়ে আবেদন ফরম টেনে নিলেন। এক নজর দেখেই বললেন, আপনার শিডিউল তো পরে। আজ না, পরে আইসেন তৃতীয়তলায় ওঠার সিঁড়িতে ছোটখাটো জটলা। সেখানে ১০-১২ জন দালালের সঙ্গে ইশারায় কথা বলছেন এক আনসার সদস্য। বুকে নেমপ্লেটে লেখা রাজিবুল।

তৃতীয়তলায় অফিসপ্রধানের কক্ষ। নাম শাহ মোহাম্মদ ওয়ালি উল্লাহ। তিনি উপ-পরিচালক। পাশের কক্ষটি তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিএ) আহমেদ আলীর। কিন্তু দুজনেই অনুপস্থিত। পিএর চেয়ারে বসে আছেন মাহবুব নামের এক অফিস স্টাফ। তিনি বলেন, স্যার মিটিংয়ে বাইরে আছেন। একটু বসেন।অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই উপ-পরিচালক এসে ঢুকলেন। এবার অনুসন্ধান টিমের এক সদস্য আবেদন ফরম হাতে উপ-পরিচালকের টেবিলে হাজির হয়। কাগজপত্র দেখে তিনি প্রশ্ন করলেন, শিডিউল তো মার্চ মাসে। এখনই জমা দিতে চান কেন? তাকে বলা হয় মেডিকেল ইমার্জেন্সি আছে। ডাক্তার দেখাতে ভারতে যাওয়া প্রয়োজন। উপ-পরিচালক বলেন, আপনার পুরোনো পাসপোর্টে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মেয়াদ আছে। নিয়ম মেনে নির্ধারিত তারিখে আসেন।এরপর কথা না বাড়িয়ে ফাইল ফেরত দিলেন তিনি। তার আগে আবেদন ফরমের কয়েকটি জায়গায় কলম দিয়ে গোল চিহ্ন দিলেন তিনি।

বিকাল ৪টা। আবেদন ফরম হাতে নিচে নামতেই জেঁকে ধরেন কয়েকজন দালাল। একজন এসে রীতিমতো ছিনিয়ে নেন ফাইল। কিন্তু পরক্ষণেই চমকে ওঠেন। গোল চিহ্নগুলো দেখিয়ে বলেন, ডিডি স্যারের টেবিলে গেছিলেন নাকি ভাই, সার তো ফাইলে গোল দাগ দিয়া দিচ্ছে। লাখ টাকা দিলেও এখন এই ফাইল আর জমা করা যাবে না।

২৮ ডিসেম্বর। সকাল ১১টা। পাসপোর্ট অফিসের অদূরে হাসান টেলিকম নামের দোকানে পাসপোর্টপ্রত্যাশীদের ভিড়। সেখানে গেলে দোকান মালিক আলমগীর বলেন, দুই হাজার টাকা দিলে তিনি ফরম জমা করে দিতে পারবেন।এরপর গোল চিহ্নযুক্ত ফরম পালটে নতুন কাগজে আবেদনপত্র প্রিন্ট করলেন তিনি। বললেন, আমি ফোন কইরা দিতাছি, পাঁচতলায় ৫০৩ নম্বর কক্ষে গিয়ে ফরমটা জমা দেবেন। সেখানে করিম নামের একজন আপনার কাছ থেকে ফাইল নিব। উনার কাছে ২ হাজার টাকা (দুহাজার) দিয়া দিবেন।তাৎক্ষণিক তাকে মোবাইলে কল দিয়ে আলমগীর বলেন, করিম ভাই, আমার আরেকটা লোক যাইতাছে, নাম রফিক। সব কাগজ মিলাইয়া ফাইল রেডি কইরা দিছি। ট্যাকা আপনের হাতে দিয়া দিব।

পাঁচতলায় ৫০৩ নম্বর কক্ষের সামনে যেতেই এগিয়ে আসেন করিম। তিনি একজন আনসার সদস্য। পুরো নাম এফ করিম। তিনি কাগজপত্র এবং ঘুসের ২ হাজার টাকা বুঝে নিলেন। এবার ফিঙ্গার প্রিন্ট এবং ছবি তোলার পালা। এজন্য চারতলায় নেমে আরেকটি কক্ষে নিয়ে গেলেন তিনি। সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন সুপারেন্টেন্ড মুসলিমা। তিনি করিমের কাছ থেকে আবেদন ফরম নিয়ে উলটেপালটে দেখলেন কিছুক্ষণ। প্রথম পাতায় সিল এবং স্বাক্ষর দিয়ে লিখলেন ৪০৫ নম্বর কক্ষ। অর্থাৎ সেখানে ছবি তুলতে হবে। তবে অজ্ঞাত কারণে সিল-সই দেওয়া আবেদনপত্র গুলোর হিসাব রাখছেন তিনি। খবরের কাগজে ঢেকে একটি সাদা কাগজে ফরমের নম্বরও লিখে রাখছেন।

জানা যায়, উত্তরা পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন গড়ে ৫শ পাসপোর্ট আবেদন জমা পড়ে। ৮০ শতাংশ আবেদন জমা হয় চ্যানেলে। অর্থাৎ ঘুস বাণিজ্যের মাধ্যমে। আবেদনপ্রতি ২ হাজার করে নেওয়া হলেও মাস শেষে ঘুসের অঙ্ক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। বিপুল অঙ্কের ঘুসের টাকা দিনশেষে ভাগবাটোয়ারা হয়। টাকার ভাগ যায় অফিসের সর্বস্তরে। প্রভাবশালীদের পকেটেও। স্থানীয় থানা পুলিশ থেকে শুরু করে একশ্রেণির অসাধু গণমাধ্যমকর্মীও ঘুসের টাকায় ভাগ বসান।

বিকাল ৪টা। উপ-পরিচালক শাহ মুহাম্মদ ওয়ালি উল্লাহর কক্ষে হাজির অনুসন্ধান টিম। তাকে পুরো ঘটনার বিবরণ শোনানো হয়। এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। সব শুনে উপ-পরিচালক হতাশা প্রকাশ করে বলেন, তিনি শত চেষ্টা করেও ফাইল জমার নামে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে পারছেন না। তার অগোচরে অনেকেই এ ধরনের তৎপরতায় লিপ্ত হচ্ছে। এটা বন্ধ করতে শিগগির কঠোর পদক্ষেপ নেবেন তিনি। এছাড়া অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিষয়ে অধিদপ্তরের উচ্চ পর্যায়কে অবহিত করা হবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     আরও পড়ুন